কেন বিএনপির ইউটার্ন?সমস্যা কোথায়!

৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের পর বিএনপি ঘোষণা করেছিল যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না। বিএনপি বলেছিল সংসদে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু নির্বাচনের একবছর না পেরোতেই বিএনপি ইউটার্ন নিয়েছে। বিএনপির সমস্ত সিদ্ধান্তগুলো বদলে গেছে। বিএনপির পাঁচজন ও একজন নারী সাংসদ শপথ নিয়েছেন, যদিও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় সংসদে যোগদান করেননি। যদিও তার জাতীয় সংসদে যোগদান না করা সিদ্ধান্ত যতটা না প্রশংসিত হয়েছে তারচেয়ে বেশি হাস্যকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বিএনপি এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসেছে। বগুড়ার উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে, এখন তারা রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনেও অংশগ্রহণ করছে।
আরও মজার ব্যাপার হলো উপজেলা নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএনপি এবং উপজেলা নির্বাচনে ‘দলের নির্দেশ অমান্য করে’ যারা উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। বেশকিছু স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সেই বিএনপি এখন ছেড়ে দেওয়া সাতটি উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএনপির এই ইউটার্ন নেতাকর্মীদের মধ্যে, বিশেষ করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে এবং কেন বিএনপি এই উল্টো পথে চলা শুরু করলো সে ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দলের নেতাকর্মীদের নেই। সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির মিটিংয়ে যখন উপজেলা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয় তখন স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্যই মুখ টিপে হেসেছেন। বিএনপির একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানার চেষ্টা করা হয় যে, কেন বিএনপির এই ইউটার্ন? সেখানে বিএনপির বিভিন্ন নেতা নানারকম মন্তব্য করেছেন। বিভিন্নরকম কারণ দেখিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. তারেক জিয়ার সিদ্ধান্ত: বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা মনে করছেন, তারেক জিয়াই এই সংসদে যাওয়া, উপ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা এবং নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। এর প্রধান কারণ রাজনীতি নয়। এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে মনোনয়ন বাণিজ্য করা যায় বলে তিনি নির্বাচনগুলোর ব্যাপারে উৎসাহী। নির্বাচনে না থাকলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকবে না এবং মনোনয়ন বাণিজ্যও হবে না এই বিবেচনা থেকেই তিনি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে একটি অংশ মনে করে।
২. মূলধারার রাজনীতি: বিএনপির অনেকেই মনে করে ২০০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করাটা ছিল মহা ভুল। যদি বিএনপি সংসদে না যেত বা উপ নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ না করত তাহলে মূলধারার রাজনীতি থেকে বিএনপি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত এবং দলে যারা নির্বাচনমুখী তারা আস্তে আস্তে নিষ্ক্রিয় হয়ে অন্য দলে জায়গা নিতেন। গত চার পাঁচ বছরে এরকম বিএনপি থেকে চলে যাওয়া লোকের সংখ্যা কম নয়। কাজেই বিএনপি মনে করছে যে, রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতেই হবে।
৩. উপায়হীন বিএনপি: বিএনপি মনে করছে যে, যতটুকু গণতান্ত্রিক সুযোগ সামনে আছে সংসদে গিয়ে কথা বলা বা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি বিভিন্ন স্থানে বসতে পারে, কথা বলতে পারে তাহলে বিএনপির শক্তির সঞ্চার হয়। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে। যেহেতু সরকারের বিরুদ্ধে অন্যকোনো জায়গায় কথা বলার স্পেস নেই সেজন্য বিএনপি মনে করছে যে, গণতান্ত্রিক ধারার মধ্য দিয়েই বিএনপিকে টিকে থাকতে হবে।
৪. বিএনপির মধ্যে যারা নির্বাচনমুখী, তাঁদের চাপ: তারা মনে করছে যে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাকছেন না, আন্দোলন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও থাকছেন না তাহলে এই রাজনৈতিক সঙ্গঠনটি করে লাভ কি হবে? যেহেতু বিএনপি কোনো আদর্শিক রাজনৈতিক সংগঠন নয় সেইজন্য এই ধরণের নির্বাচনমুখী চাপকে বিএনপি নিরুৎসাহিত করতে পারছে না।
৫. আন্তর্জাতিক মহলের চাপ: আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বিএনপি বারবার ধর্না দিচ্ছে, বারবার আন্তর্জাতিক মহলের দ্বারস্ত্র হওয়ার পরও আন্তররাজতিক মহল থেকে বিএনপি তেমন কোনো সহানুভূতি বা সহযোগিতা পাচ্ছে না। বরং তাঁদেরকে বারবার বলা হচ্ছে মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে। নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিএনপিকে সরকারের ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো দেখিয়ে দিতে হবে এরকম একটি পরামর্শ কূটনৈতিক মহল থেকে এসেছে। এ কারণেই বিএনপি এখন ইউ টার্ন নিয়েছে। তবে বিএনপির যে পরিবর্তিত নীতি সেই নীতির ব্যাপারে বেগম খালেদা জিয়া সম্পূর্ণ দ্বিমত হয়েছে বলে জানা গেছে। বেগম খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে বিএনপি এই নির্বাচনমূখী পরিবর্তিত অবস্থান ঘোষণা করেছে

SHARE